বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ০৫:০৭ পূর্বাহ্ন

কোরবানির জন্য অনেকের পছন্দ মহিষ, কিন্তু কেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
কোরবানির জন্য অনেকের পছন্দ মহিষ, কিন্তু কেন

হামিদুল হকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায়। একসময় পবিত্র ঈদুল আজহায় তাঁদের বাড়িতে গরু কোরবানি দেওয়া হতো। তবে তিন বছর ধরে আর গরু কোরবানি হচ্ছে না হামিদুলের বাড়িতে। গরুর পরিবর্তে হামিদুল ও তাঁর পরিবারের পছন্দ মহিষ।

এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় হামিদুলদের বাড়িতে মহিষ কোরবানি দেওয়া হচ্ছে। হামিদুল হকের বাবা ও তাঁর চার ভাই মিলে এবার ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে একটি মহিষ কিনেছেন।

হামিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাবার কোরবানির জন্য মহিষ পছন্দ। গরুর তুলনায় মহিষের মাংস নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। এসব বিবেচনায় প্রতিবছর মহিষ কোরবানি দেওয়া হচ্ছে।

কেবল হামিদুল হকের পরিবার নয়, এখন অনেকেই কোরবানির জন্য গরুর পরিবর্তে মহিষ বেছে নিচ্ছেন। সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত আছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯টি মহিষ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে সাধারণত কোরবানির জন্য গরু-ছাগল বেশ জনপ্রিয়। কোরবানির সংস্কৃতিতে মহিষ ততটা জনপ্রিয় ও প্রচলিত নয়। তবে মহিষের মাংস তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। সেই কারণে কোরবানির জন্য মহিষ ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

কোরবানির মহিষ এবার দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের এলবিনো জাতের মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। মহিষটির মাথার সামনের চুলের ধরন অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো। তাই পশুটির এমন নাম রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকার একজন ক্রেতা ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে’ কিনে নিয়েছেন।

কোরবানির জন্য মহিষের চাহিদা দেখা গেছে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটেও। গত শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেরানীগঞ্জ থেকে ‘টাইগার’ নামের একটি মহিষ এনেছেন মজিবর রহমান নামের এক খামারি। দাম হাঁকছেন ২৫ লাখ টাকা। সঙ্গে বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে একটি ভুট্টি গরু (ছোট আকারের গরু)। প্রায় ১ টন ওজনের মহিষটি দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, মহিষের মাংস তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত। এতে ফ্যাট ও কোলেস্টরল কম, মিনারেল বেশি। স্বাদও ভালো। তাই মহিষ কোরবানি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশ-বিদেশে সাড়া ফেলে দেওয়া গোলাপি রঙের এই মহিষের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’

ভাগে মহিষ কোরবানি

কোরবানির জন্য মহিষ কিনেছেন এমন তিনজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সবাই ভাগে মহিষ কোরবানি দিচ্ছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের জুয়েল হোসেন স্থানীয় একটি পশুর হাটে মহিষ কিনতে গিয়ে ফেসবুকে লাইভ করেছেন। যে মহিষটি কিনেছেন, সেটির ছবিও ফেসবুকে দিয়েছেন।

জুয়েল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ২ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে মহিষ কিনেছেন। সাতজন মিলে কোরবানি দেবেন।

এর আগেও মহিষ কোরবানি দিয়েছেন জানিয়ে জুয়েল বললেন, গরুর চেয়ে মহিষের দাম বেশি। এরপরও সাতজন মিলে মহিষ কিনেছেন। সবারই মহিষ পছন্দ। তবে যখন দেখা যায় পর্যাপ্ত টাকা নেই, তখন তাঁরা কোরবানির জন্য গরু কেনেন।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সন্তোষপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান নিজেই একজন খামারি। তিনি গরু, মহিষ ও ভেড়া পালন করেন। এবার কোরবানিতে ছয়টি মহিষ বিক্রি করেছেন।

মাকসুদুর প্রথম আলোকে জানান, চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে মিলে মহিষ কোরবানি দেবেন তিনি। নিজের খামারে পশুটি লালন-পালন করেছেন।

মাকসুদুর বলেন, মহিষ কোরবানি দেওয়ার প্রধানত দুটি কারণ। গরু ও ভেড়ার তুলনায় মহিষে মাংস বেশি হয়। আর মহিষের মাংস খেলে অ্যালার্জি হয় না। এটা স্বাস্থ্যসম্মত।

কোরবানির জন্য এই মহিষ ঢাকা থেকে নেওয়া হচ্ছে নড়াইলে  

কোথাও বিক্রি ভালো, কোথাও কম

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে যেসব এলাকায় চারণভূমি ও জলাভূমি আছে, সেসব এলাকা মহিষ পালনের উপযোগী। ভোলা, নোয়াখালী, বাগেরহাট, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের চর এলাকা (টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম) এবং সিলেটে বেশি মহিষ লালন-পালন হয়ে থাকে।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ভোলার চারজন মহিষ লালন-পালনকারীর সঙ্গে কথা হয়। চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহিষ লালন-পালনকারীরা বলছেন, তাঁরা কোরবানির জন্য যেসব মহিষ প্রস্তুত করেছিলেন, সেগুলো বিক্রি হয়েছে বা হচ্ছে। আর ভোলার মহিষ লালন-পালনকারী বলছেন, তাঁর মহিষ তেমন বিক্রি হয়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের বাসিন্দা মো. তারেকুল্লাহ এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার আগে বিক্রির জন্য জন্য ৪৫টি মহিষ প্রস্তুত করেছিলেন। গতকাল সোমবার দুপুরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তখন পর্যন্ত ৩৭টি মহিষ বিক্রি হয়েছে। সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় এসব মহিষ বিক্রি করেছেন। সরাইলে অনেকেই মহিষ কিনেছেন।

ভোলার খামারি আবুল কাশেম মাস্টার বলেন, মহিষের দাম তুলনামূলক কম। তারপরও তাঁর প্রস্তুত করা হাতেগোনা কয়েকটি মহিষ বিক্রি হয়েছে।

ভোলার মানুষের মধ্যে মহিষ কোরবানির প্রচলন খুব একটা চোখে পড়ে না। তাই নিজের মহিষ চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিক্রির জন্য পাঠান বলে জানালেন আবুল কাশেম।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মৃন্ময় ভৌমিক বললেন, সন্দ্বীপের পশুর হাটে প্রচুর মহিষ উঠেছে। এ অঞ্চলের মানুষের মহিষের মাংসের প্রতি আগ্রহও আছে। তাই মহিষ কোরবানি দিন দিন বাড়ছে।

সূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...