শিরোনামঃ
ট্রাম্প কি ইরানের সঙ্গে চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছেন? মানসিক চাপ যেভাবে ব্রণ বা চর্মরোগের সমস্যা বাড়াতে পারে রাশিয়া থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পেতে যাচ্ছে তালেবান সরকার নরম খোলসের কাঁকড়া নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে কেন কলকাতা ও আশেপাশে এবারে কোরবানির ঈদ কতটা অন্যরকম ছিল? ঢাকার কাঁচাবাজারগুলো সুনসান সাইপ্রাসে এস আলম ও স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পদ জব্দের নির্দেশ আদালতের যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তির খুব কাছাকাছি আছে, তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি: ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি নিয়ে ধোঁয়াশায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতায় পদ্মা ব্যারাজকে কীভাবে দেখব
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০৯:১৯ অপরাহ্ন

তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতায় পদ্মা ব্যারাজকে কীভাবে দেখব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতায় পদ্মা ব্যারাজকে কীভাবে দেখব

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দেশের নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। সম্পূর্ণ প্রকল্প সম্পন্ন করতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্প নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। প্রকল্পটির স্বার্থেও কিছু প্রশ্ন উঠেছে, যা আমলে নেওয়া প্রয়োজন।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সুফল পেতে হলে কিছু বিষয় তো অবশ্যই ভাবতে হবে। প্রকল্পে যদি সেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে কোনো কথা নেই। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প কার্যকর করতে শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকতে হবে। কেবল বর্ষা মৌসুমে ধরে রাখা পানিতে প্রকল্পের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না। ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে পানি না পেলে বিকল্প করণীয় ঠিক করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণ করলে পরিবেশগত এবং ব্যারাজের উজানে-ভাটিতে যে ক্ষতি হবে, এর পরিমাণও চিহ্নিত করতে হবে। ভারত থেকে নদীতে পানি পাওয়া না–পাওয়া, নদীর ভাঙন, পলি অপসারণ, সমুদ্র উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ অনেক বিষয় আছে।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে দেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা সেচ প্রকল্প’ খুব কাছ থেকে পর্যালোচনা করছি। ভারত নদীর প্রশ্নে বাংলাদেশের সঙ্গে কত নির্মম আচরণ করে, তা দেখেছি। পাউবো তিস্তা নদীর প্রায় ২০টি শাখানদী এবং উপনদী কীভাবে মেরে ফেলেছে, সে সম্পর্কেও বিস্তর ধারণা আছে। তিস্তা নদী তথা তিস্তা সেচ প্রকল্পের করুণ বাস্তবতার কারণে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরের সূত্রে জানতে পারি, ১৯৬১ সালে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০২-২০০৩ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার এই ব্যারাজ নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করছে। বলা হচ্ছে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীতে নাব্যতা ফেরানো হবে এবং ছোট একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে।

নামকরণ কতটা যৌক্তিক

গঙ্গা নদীতে অনুমোদিত প্রকল্পের নাম পদ্মা ব্যারাজ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছয় খণ্ডে প্রকাশিত বাংলাদেশের নদ-নদী বইয়ে গঙ্গা ও পদ্মার আলাদা পরিচিতি নম্বর দেওয়া আছে। গঙ্গা নদীর পরিচিতি নম্বর এনডব্লিউ ২৭ এবং পদ্মা নদীর পরিচিতি নম্বর এনসি ৩২। মূলত গঙ্গা নদী যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর নাম হয়েছে পদ্মা। গঙ্গা নদীতে ব্যারাজ হলে অবশ্যই এর নাম হওয়া প্রয়োজন গঙ্গা ব্যারাজ।

পদ্মা ব্যারাজ বলায় ভারত কৌশলগত সূক্ষ্ম লাভবান হতে পারে। রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেছেন, ‘প্রকল্পটির নাম গঙ্গা ব্যারাজের বদলে পদ্মা ব্যারাজ রাখা ভূরাজনৈতিক দিক থেকে ভুল। কারণ, তাতে গঙ্গা নদীতে ভাটির দেশের অধিকার যেচে ছেড়ে দেওয়া হবে; ভারত সেটাই চায়।’

তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কেমন

তিস্তার উজানে যেমন ভারতের ব্যারাজ আছে, গঙ্গার উজানেও ব্যারাজ আছে। আগামী ডিসেম্বরের পর তিস্তার মতো গঙ্গায়ও কোনো চুক্তি থাকবে না। তিস্তার মতো কালো থাবা গঙ্গার পানিতে ফেলতে পারে ভারত। তিস্তার পানি নিয়ে ভারত কী করেছে, তা নিশ্চয়ই মনে আছে।

২০১১ সালে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাদ সাধায় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হয়নি। উপরন্তু ২০১৪ সাল থেকে তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করা শুরু হয়েছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমি সেচ প্রকল্পের আওতায় ছিল। হঠাৎ সেই বছর তিস্তার পানি শতভাগ প্রত্যাহার করে ভারত। সেচ প্রকল্পের আওতায় থাকা জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়েছিল। একই ঘটনা যদি গঙ্গায় ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ পানি পাবে কোথায়?

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিমাণ জমিতে সেচ দেওয়ার মতো পানি কি আমরা পাব? এখন মমতা নেই, কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর আমলে পদ্মায় পানি পাওয়া যাবে, এই নিশ্চয়তা কতটুকু?

তিস্তা নদীর পানি ভারত প্রত্যাহার করার পর মাটির নিচ দিয়ে যেটুকু প্রবাহ আসে, বাংলাদেশ সেই পানি ব্যারাজের উজানে আটকে রেখে পার্শ্ববর্তী খাল দিয়ে কোনো রকমে প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রার চার ভাগের এক ভাগ জমিতে সেচ পরিচালনা করে।

এই সময়ে ব্যারাজের ভাটিতে থাকা তিস্তা শুকিয়ে কাঠ হয়। মানুষ হেঁটে তিস্তা নদী পারাপার করে। লড়াই-সংগ্রাম, সভা-সেমিনার, লেখালেখি—কোনোভাবেই তিস্তায় ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন চায় না ভারত। তারা বিরোধিতা করেছে। তিস্তার মতো গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করলে বাংলাদেশ কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, তার রূপরেখা স্থির করতে হবে।

তিস্তা ব্যারাজ স্থাপনের পর ব্যারাজের ভাটিতে নদী খুবই অদ্ভুত আচরণ করেছে। ভাটিতে নদীর ভাঙন ত্বরান্বিত হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ ভারত গজলডোবায় সব জলকপাট খুলে দেয়। তখন ক্ষিপ্র বেগে বাংলাদেশে পানি প্রবেশ করে। ভাঙন ও বন্যা তখন ভাটিতে সীমাহীন ক্ষতির কারণ হয়। ২০২১ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে বৃষ্টি না থাকলেও গজলডোবায় সব জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। সে বছর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিস্তার পানি সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠেছিল। পদ্মায় যাতে ভারত বেশি ক্ষতি করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

সুফল কীভাবে মিলবে

পানি না পাওয়া গেলে, কম পাওয়া গেলে কিংবা বর্তমানের সমান পাওয়া গেলেও ব্যারাজের ভাটিতে পানির প্রবাহ বর্তমানের মতো থাকবে না। ব্যারাজ থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে যমুনা-গঙ্গার মিলনস্থল পর্যন্ত স্রোত অনেক কমে যাবে। প্রতি সেকেন্ডে নদীর পানির নির্দিষ্ট গতিস্রোত পলিকে গতিশীল রাখে। সেই গতিস্রোত কম হলে পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হতে বাধ্য। ব্যারাজের কারণে নদীতে পলি পড়লে সেই পলি অপসারণের ব্যবস্থাও রাখা চাই। ব্যারাজের ভাটিতে গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনার শাখানদীগুলো পানির স্বল্পতায় মারা যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

সমুদ্রের উপকূলে কি লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে

গঙ্গা-যমুনার মিলনে সৃষ্ট পদ্মার পানি মেঘনা হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়। পদ্মা-মেঘনার পানির স্রোত কম থাকলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উজানের দিকে বেশি চলে আসবে। গঙ্গার পানি আটকে রেখে কাজ করলে অবশ্যই স্রোতশক্তি অনেকটা কম হবে। তখন লবণাক্ত পানিতে সমুদ্রের উপকূলে ক্ষতির পরিমাণ কি বৃদ্ধি পাবে? বৃদ্ধি পেলে ক্ষতি কমানোর উপায় প্রয়োগ করতে হবে।

মাছের উৎপাদন কি বাড়বে

পদ্মা ব্যারাজ স্থাপনে ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলা হয়েছে। মাছ চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হবে। তিস্তা সেচ প্রকল্প গ্রহণ করার সময়েও মাছ চাষের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলা হয়েছিল। খালগুলো বাস্তবে মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত না হওয়ায় মাছ চাষ হয় না; বরং ব্যারাজের কারণে তিস্তায় মাছের উৎপাদন অনেকে কমেছে। অনেক প্রজাতির মাছ তিস্তা থেকে বিদায় নিয়েছে। যেমন ব্যারাজের ঠিক ভাটিতে ডিমওয়ালা মাছ যখন উজানে যেতে পারে না, তখন তাদের ডিম দেওয়ায় বাধার সৃষ্টি হয়। ফলে মাছ কমতে থাকে। পানি যখন কমে যাবে, তখন গভীর পানির মাছ আর না–ও থাকতে পারে। জলজ উদ্ভিদ-প্রাণিবৈচিত্র্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিস্তায় মাছ চাষ না হওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।

দূরবর্তী আশঙ্কা

দূরবর্তী একটি দুশ্চিন্তার কথা বলে রাখি। ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহারের নানা আয়োজন করছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি যদি ভারত কিংবা চীন প্রত্যাহার করে, তাহলে যমুনা নদীতে এখনকার মতো পানি থাকবে না। যমুনায় পানি না থাকলে এবং গঙ্গার পানিতে সেচকাজ করলে পদ্মা নদীর অবস্থা শুকিয়ে তিস্তার মতো কাঠ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকায় তখন ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে। ভারত আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প ধরলা পর্যন্ত এগিয়েছে। তারা ব্রহ্মপুত্রের পানি খালের মাধ্যমে যতটা সম্ভব প্রত্যাহার করতে চায়। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথাও ভেবে রাখতে হবে।

মতামত গুরুত্ব পাবে কি

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে যাঁরাই যে সমালোচনা করছেন, প্রশ্ন উত্থাপন করছেন, প্রকল্প শুরু করার আগে সরকারের উচিত হবে সেগুলোর বাস্তবতা আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা। নিছক প্রকল্পের বিরোধিতা নাকি সেই বিরোধিতার কোনো ভিত্তি আছে, তা অবশ্যই ভাবতে হবে। যাঁরা সমালোচনা করছেন, যাঁরা নদী বোঝেন—সবার মতামত গ্রহণ করা প্রকল্পের জন্য কল্যাণের হবে।

তিস্তা নদীসহ অনেক নদীর চরম সর্বনাশ করেছে আমাদের অপরিণামদর্শী কিছু প্রকল্প। সে কারণে নানাবিধ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনগণের অর্থে গৃহীত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প যাতে অপরিণামদর্শী প্রকল্পের পথে না যায়, এটাই প্রত্যাশা।

  •  তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

সূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...