বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন

প্রতিবছর কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়, তবু কাদাপানিতে দাঁড়িয়েই পশু কেনাবেচা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
প্রতিবছর কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়, তবু কাদাপানিতে দাঁড়িয়েই পশু কেনাবেচা

বিদ্যালয়ের মাঠে বছরের পর বছর ধরে বসছে কোরবানির পশুর হাট। নেই পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা, নেই চলাচলের উপযোগী রাস্তা। এ কারণে প্রায় হাঁটুসমান কাদাপানির মধ্যেই চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা। আজ মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার খোঁচাবাড়ি পশুর হাটে গিয়ে এমন দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায়। অথচ এ হাট থেকে প্রতিবছর সরকার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করছে।

সরেজমিন দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে কোনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দৌলতপুর সোলেমান খান বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠজুড়ে বসেছে পশুর হাট। সোমবার রাতের সামান্য বৃষ্টিতে মাঠজুড়ে জমেছে পানি। এমন অবস্থায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে হাটে ঢুকতে হচ্ছে। কেউ কেউ গরু-ছাগল টেনে নিতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন। অনেকের পা প্রায় এক ফুট পর্যন্ত কাদায় ডুবে যাচ্ছে।

শহরের আশ্রমপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মনিরুল হুদা কোরবানির গরু কিনতে হাটে এসেছেন। হাটের মুখে কাদাপানি দেখে কোনোভাবেই ভেতরে যেতে চাচ্ছিলেন না। উপায়ন্তর না দেখে হাটের কোণের একটি দোকান থেকে পলিথিন নিয়ে দুই পায়ে জড়িয়ে নিলেন। এরপর পছন্দের গরু খুঁজতে কাদাপানি মাড়িয়ে হাটের ভেতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। কয়েক মিনিট পর কাদামাটি মেখে ফিরে এলেন। মনিরুল বললেন, ‘এভাবে গরু কেনা সম্ভব!’ বলেই হাট থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

গরুর রশি ধরে দাঁড়িয়েছিলেন সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি গ্রামের নরেশ রায়। তাঁর পায়ের কিছু অংশ কাদার ভেতরে ঢুকে আছে। এতে তাঁর বিরক্তির শেষ নেই। তিনি বললেন, ‘দাদা, সরকার খালি হামারটে টাকা নেয়। হামার দুঃখ-কষ্টখান দেখে না। হাটত ঢুকিবা গেইলে আগত হাটের বাহিরত স্যান্ডেল রাখে আসা নাগে। কাদাপানিত দাঁড়াইয়া বেচাকেনা করিয়া হামার পায়ে ঘা ধরে যাবা নাগছে।’

একই অবস্থা ভূল্লী উপজেলার মাটিগাড়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের। তিনিও দুটি গরু নিয়ে কাদাপানিতে দাঁড়িয়ে ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছেন। আনোয়ার বলেন, ‘এমন কষ্ট করি কী এইটে গরু বেচাবা যায়? এমনিতে দুর্গন্ধ, ফের সারাটা দিন কাদার মাঝোত দাঁড়ায়ে থাকিবার নাগে।’

কোরবানির গরু কিনতে এসে হতাশ শহরের শান্তিনগর বাসিন্দা আরশাদ আলী। তিনি বললেন, ‘এমনিতেই আজ গরুর দাম চড়া। তার ওপর হাট কাদাপানিতে একাকার। দুইয়ে মিলে একপ্রকার অস্বস্তির মধ্যে আছি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খোঁচাবাড়ি হাট পশু কেনাবেচার জন্য প্রসিদ্ধ। জেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ এ হাটে পশু কেনাবেচা করতে আসেন। সপ্তাহের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। রাজস্ব আদায়ের হিসাবে এটি জেলার অন্যতম বড় পশুর হাট।

হাটের ইজারাদার রবিউল ইসলাম বলেন, এ বছর এক কোটি ২৫ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি হলে হাটে পানি জমে যায়। বৃষ্টির পর কাদায় চারপাশ একাকার থাকে। এমন পরিবেশে অনেকেই এ হাটে গরু কিনতে আসতে চান না। এতে ক্রমেই হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা কমে আসছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব আয়ের একটা অংশ হাট উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ চোখে পড়ে না। ফলে বছর বছর আমাদের একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ২০১১ সালের ১ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা সরকারি হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা, ইজারা পদ্ধতি ও আয় বণ্টন নীতিমালা অনুযায়ী, হাট ইজারার ১৫ শতাংশ অর্থ সংশ্লিষ্ট হাটের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় করার কথা। এ অর্থ দিয়ে নর্দমা নির্মাণ, চলাচলের রাস্তা উন্নয়ন, ছাউনি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করার নির্দেশনা রয়েছে। প্রয়োজনে কিছু ক্ষেত্রে এ বরাদ্দ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোরও সুযোগ আছে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ হাটেই সেই উন্নয়নের ছোঁয়া নেই।’

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি হলে পশুর হাটে পানি জমে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভোগান্তি হচ্ছে, এটা সত্য। কোরবানির মৌসুমে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে পরে সংশ্লিষ্ট কমিটির সভা করে পানিনিষ্কাশন, নালা, গণশৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পশুর হাটটির কিছু অংশ বিদ্যালয়ের। এ কারণে স্থায়ীভাবে উন্নয়নকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...