বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন

ফেনীতে জুলাই শহীদ শিহাব ও সবুজ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল

ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফেনীর মহিপালে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ওয়াকিল আহমেদ শিহাব ও টমটম চালক মো. সবুজ হত্যা মামলায় আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। এতে ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ ৩৭৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

শিহাব ও সবুজ হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিল করার মধ্যদিয়ে ফেনীর ঘটনায় মোট ৮ টি হত্যা মামলার মধ্যে তিনটির চার্জশিট দাখিল করা হলো।
এর আগে মাহবুবুল হক মাসুম হত্যা মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। মামলাটিতে প্রধান আসামী আওয়ামী লীগ সভাপতি গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া আওয়ামী লীগের  সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জা খাঁন কামালের নামও চার্জশিটে রয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ওয়াকিল আহমেদ শিহাব হত্যা মামলায় ২৫০ জন ও সবুজ হত্যা মামলায় ১২৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা। আগামী ১১ ডিসেম্বর সবুজ হত্যা মামলা ও ১৮ জানুয়ারি শিহাব হত্যা মামলার চার্জশিট পর্যালোচনার জন্য দিন ধার্য করেছে আদালত।

এ ব্যাপারে সবুজ হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফেনী মডেল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. ফারুক মিয়া বলেন, এ মামলায় এজাহারনামীয় ৬৫ জন ও তদন্তে নাম পাওয়া আরও ৫৯ জনসহ মোট ১২৪ জনকে অভিযুক্ত করে মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) আদালতে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ মামলায় এজাহারনামীয় ৫ জন ও সন্দেহভাজন ৩৯ জনসহ মোট ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাদের মধ্যে কেউ আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়নি।

অন্যদিকে ওয়াকিল আহমেদ শিহাব হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফেনী মডেল থানার উপপরিদর্শক মোতাহের হোসেন বলেন, শিহাব হত্যা মামলায় এজাহারনামীয় ১৪৮ জন ও তদন্তে প্রাপ্ত ৯২ জনসহ মোট ২৫০ জনের নামউল্লেখ করে গত ৮ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় এজাহারনামীয় ১৩ জন ও সন্দেহভাজন ৪৯ জনসহ মোট ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় মেজবাহ উদ্দিন মেজু, এনামুল হকসহ ছয়জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নবী মেম্বার ও ওসমান গণি লিটন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনায় সম্পৃক্ততা না থাকায় এ মামলায় তিনজনকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের নাম-ঠিকানা মিল পাওয়া যায়নি।

এর আগে, গত বছরের ৪ আগস্ট মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নির্বিচারে করা গুলিতে প্রাণ হারান ওয়াকিল আহমেদ শিহাব ও টমটম চালক মো. সবুজ। এ ঘটনায় ওই বছরের ২০ আগস্ট নিহত ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর এলাকার ওয়াকিল আহমেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ ১৫১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া আরও ১০০-১৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
শিহাবের বাড়ি ফেনীর সদর উপজেলার দক্ষিণ কাশিমপুর গ্রামে। আর সবুজের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে। সে ফেনীতে অটোরিক্সা চালাতেন।

একই বছরের ১৩ আগস্ট আন্দোলনে নিহত সবুজের ভাই মো. ইউছুপ বাদী হয়ে ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, ফেনী সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল, সাবেক পৌর মেয়র স্বপন মিয়াজীসহ ৬৫ জনের নাম উল্লেখ ও ৩০০-৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৪টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ৭টি হত্যা মামলা ও ১৭টি হত্যাচেষ্টা এবং সহিংসতার অভিযোগ।

এর আগে শিহাব হত্যা মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য ফেনীর আদালতের পিপি সুপারিশ পাঠান স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে। মানবজমিন-এ এমন সংবাদ প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। জেলা প্রশাসন কতৃক গঠিত মামলা প্রত্যার সংক্রান্ত উপি কমিটির যাচাবাছাই ক্রমে জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মেছবাহ উদ্দীন খাঁনের সুপারিশটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় চলতি বছরের ২৩ র্মাচ। ঘটনার স্থান হিসেবে ফেনী থানাধীন তথ্য দিয়ে এফআইআর অনুযায়ী আসামী হিসাবে ক্রমিক নং উল্লেখ করা হয় আবদুল্লা আল মহসিন ও আবুল কালাম ওরপে ছালাম উল্যাহর নাম।

মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হয়রানী মূলক মামলা প্রত্যাহারের তালিকায় জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শিহাবের মামলাটি তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অথচ মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা চাওয়া হয় ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের রাজনৈতিক হয়রানি মামলার তালিকা। সে তালিকা তৈরির জন্য একটি কমিঠি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার. চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ও দায়রা জজের একজন করে প্রতিনিধি এবং পিপি এ কমিটির সদস্য। বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদন যাচাইবাছাই করে এ কমিটি ৫৮০টি মামলা প্রত্যাহারের জন্য ১৬/১২/২০২৪ ইং সুপারিশ পাঠায় মন্ত্রনালয়ে।  ইতোমধ্যে ২২৩টি মামলা প্রত্যাহার করে গেল ৩০/৬/২০২৫ ইং জেলা পিপির কাছে চিঠি পাঠায়। বাকিগুলো পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত সিহাবের মামলাটি প্রত্যাহারের সুপারিশে পিপি স্বাক্ষর ও সিল দেয় তারিখ দেন ২৩/৩/২০২৫ ইং। প্রশ্ন উঠে কত কৌশল খাটানো হয়েছে এ মামলা প্রত্যাহারের চেষ্টায়। যদিও পিপি সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনাকে জালিয়াতি বলে দাবি করেছেন।

এদিকে হত্যা মামলাগুলোর বাদী পক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঞা বলেন, আসামী কারা তা মুখ্য বিষয় নয়, ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এম আশা ফেনীবাসীর।


এ জাতীয় আরো খবর...