বাংলাদেশি সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার। যার প্রকৃত নাম ছিল আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মাজুপুর গ্রামে জন্ম তার। বাবা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্ এবং মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন৷
শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯৬৯ সালে উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৮৩ সালে সাংবাদিকতায় মরণোত্তর একুশে পদক এবং সাহিত্যে ১৯৯৮ সালে গল্পে অবদান রাখার জন্য মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
গুণী এই মানুষকে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হারিয়ে ফেলে বাঙালি জাতি। ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসতম ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছিল এদিন। সেদিনের বুদ্ধিজীবীদের নিহত ও গুম হওয়ার তালিকায় শহীদুল্লাহ কায়সারও ছিলেন। তাকে হারানোর লোমহর্ষক ঘটনা জানালেন তারই বোন শাহেনশাহ বেগম।
তিনি বলেন, আমার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে এভাবে নিয়ে যাবে, তা আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে চা খেতাম। সেদিনও (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১) একসঙ্গে চা খাচ্ছিলাম। বড় ভাই (শহীদুল্লাহ কায়সার) সবাইকে ডেকে চায়ের কাপ তুলে দিতেন। সবাই চা খেতাম আর গল্প করতাম। সেদিনও এরকম একটি দিন ছিল। হঠাৎ বড় ভাইয়ের ফোন আসে। সে ভেতরে চলে যায়, কিন্তু আর এল না। আমরাও চা খাওয়া শেষ করে যার যার রুমে চলে যাই।
শাহেনশাহ বেগম বলেন, ১৪ ডিসেম্বর এয়ার রেইড হচ্ছিল। ভারত যুদ্ধে অংশ নেয়ায় ঢাকার আকাশে এয়ার রেইড হচ্ছিল। এতে কাচের জিনিসপত্র কাঁপুনি দিয়ে ভেঙে যাচ্ছিল। আবার দৌড়ে ছাদে উঠছিলাম। তখন বড় ভাই বলছিলেন, তোমরা এমন কেন, দৌড় দিয়ে ছাদে উঠো। ছাদে গিয়ে কি দেখো? তার বড় মেয়ে শমী কায়সার তখন দুই বছরের মতো হবে। আমরা যুদ্ধ দেখিনি বলে ছাদে যেতাম।
তিনি বলেন, আমরা কাচের জিনিসপত্র সরাচ্ছিলাম। এয়ার রেইড হলেই তো সব ভেঙে যায়। বাড়িতে তিনটি গেট ছিল। মেইন গেট ছিল স্টিলের। সেটা দিয়ে কেউ টপকাচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে। সেদিন সন্ধ্যার ঘটনা। আমাদের একটি কুকুর ছিল, তখন কুকুরটি খুব চেঁচাচ্ছিল। তখন বড় ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া কেউ গেট খুলতাম না।
ঘটনার দিন বিকেলে সবাই রেডিওতে স্বাধীন বাংলার বেতারে খবর শুনছিলেন বলেও জানান শহীদুল্লাহ কায়সার এই বোন শাহেনশাহ বেগম। তিনি বলেন, রাইফেল নিয়ে কারও যাওয়ার সময় শব্দ হয়। তখন এত শব্দ হচ্ছিল যে, সবাই এলার্ট। কেউ উপরে যাচ্ছে, কেউ নিচে নামছে। আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি একবারে সিঁড়ির ক্রসিংয়ের সামনে।
তিনি বলেন, বড় ভাই কিন্তু ফোন শেষ করছে না। খুব দীর্ঘ সময়। সে তো কখনো এত সময় ফোনে থাকে না। পড়ে বুঝলাম, সে বলছিলেন, সাদরীর ফোন এসেছিল (শহীদুল্লাহ কায়সারের বন্ধু)। বড় ভাই আর আসছিলেন না। এখন আমি কী করব? পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। নিচে কী হচ্ছে, শুধু আওয়াজ পাচ্ছি। নিচে আমার ছোট ভাইকে মাথায় আঘাত করে ওখানে বসে রইলেন একজন কি দু’জন লোক। পুরোনো রাইফেল থাকে না, তেমন। আমি আবার একটু অন্যরকম। কিছু দেখতে গেলে পুরো দৃশ্য দেখে ফেলি।
শাহেনশাহ বেগম বলেন, উপরে যে এসেছেন, ছোটভাই আর আমার হাজব্যান্ড, ওদের ওখানে আটকে দিয়ে পেছনে রাইফেল ধরে রেখেছে। আমি সিঁড়ির ক্রসিংয়ে, আমি আর নড়াচড়া করি না। ভয় তো পেতামই না। বড় ভাইকে যে একদম হারিয়ে ফেলব, তা ভাবতেও পারিনি।
তিনি বলেন, তখন ছোট ভাই আর আমার হাজব্যান্ডকে পেছন থেকে দু’তিনজন রাইফেল ধরে বড় ভাইকে (শহীদুল্লাহ কায়সার) খুঁজছে। বাসায় খোঁজাখুঁজি করছে। ভাবছিলাম গ্রেপ্তার করতে এসেছে, আমাদের তো কিছু করবে না। ভেবেছি বড় ভাইকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব, আজকে গ্রেপ্তার করতে দেব না। আবার ভাবছি ছোট ভাই ও আমার হাজব্যান্ডকে পেছন থেকে রাইফেল ধরে রেখেছে।
শহীদুল্লাহ কায়সারের বোন বলেন, ব্ল্যাকআউট চলছে। তারা যখনই সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে এসেছে, আমি তখনই লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছি। এ সময় একজনের মুখেই মাস্ক ছিল। তিনি খালেক মজুমদার।
শাহেনশাহ বেগম বলেন, মাগরিবের আজানের সময় সবই দেখা যায়। নিচে কলিংবেল বাজছিল। তখন বড় ভাই বলছিলেন, তোমরা গেট খুলছো না কেন? তিনি ভেবেছেন, পাকিস্তানি আর্মিরা শেল্টার নিতে এসেছেন। আমি সব লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে সবার চেহারা দেখছি। আমার কাছে মনে হচ্ছিল সেখানে একজনও পাকিস্তানি আর্মি ছিল না। খালেক মজুমদার মুখোশ পরা ছিল। আর সব ছিল আমাদের বাঙালি।
চ্যানেল 24 এর সৌজন্যে