বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ০২:২২ পূর্বাহ্ন

২২ মণের কালা চান ও ১৮ মণের সাদা চান বিক্রি না হওয়ায় উৎকণ্ঠায় খামারি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

বছরের পর বছর পরম যত্নে লালন-পালন করে কোরবানির হাটের জন্য বিশাল আকৃতির গরু প্রস্তুত করেছিলেন ভোলার খামারি দুলাল ব্যাপারী। কিন্তু ঈদ সামনে এসেও কাঙ্ক্ষিত দামে গরু বিক্রি না হওয়ায় এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। রাতেও ঘুম আসে না। কারণ, গরু বিক্রি না হলে আবারও এক বছর ব্যয়বহুল খাবার কিনে পালন করতে হবে।

ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চরমনোষা গ্রামের ব্যাপারী বাড়ির খামারি দুলাল ব্যাপারী এবার কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ২২ মণ ওজনের ‘কালা চান’ এবং ১৮ মণের ‘সাদা চান’ নামে দুটি বিশাল গরু প্রস্তুত করেছেন। বিশাল আকৃতির গরু দুটি দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন তাঁর খামারে।

দুলাল ব্যাপারী জানিয়েছেন, খামারে দেশীয় পদ্ধতিতে মোট ১০টি গরু লালন-পালন করছেন। এর মধ্যে হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের কালা চান ও সাদা চান সবচেয়ে বড়। কালা চানের দাম হাঁকানো হচ্ছে ৮ লাখ টাকা এবং সাদা চানের দাম ৭ লাখ টাকা। প্রতিটি গরুকে প্রতিদিন দুই বেলায় মোট ১৮ কেজি দানাদার খাবার খাওয়ানো হয়। এ ছাড়া খাবার হিসেবে আছে জার্মান ঘাস, মিষ্টিকুমড়া, আলু, ভুট্টা ও গমের ভুসি। সপ্তাহে এক দিন আপেল কিংবা কমলাও খাওয়ানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন দুলাল ব্যাপারী, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে। গরুগুলোকে তাঁরা পরিবারের সদস্যের মতো আপন মনে করেন।

দুলাল ব্যাপারী জানান, স্থানীয় মালেরহাট এলাকার একটি খামার থেকে দুটি গাভি কিনেছিলেন তিনি। পরে সেই গাভির বাচ্চা হিসেবে জন্ম নেয় কালা চান ও সাদা চান। প্রায় তিন বছর ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু দুটি বড় করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অসৎ উপায়ে গরু মোটাতাজা করিনি। দেশীয় খাবার খাইয়ে বড় করেছি। কালা চানের ওজন প্রায় ২২ মণ, সাদা চানের ১৮ মণ। ১৫ লাখ টাকার কমে গরু দুটি বিক্রি করলে আমার লোকসান হবে।’

গত দেড় বছরে গোখাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে মন্তব্য করে দুলাল ব্যাপারী বলেন, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ভুসির দাম ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এখন গরু বিক্রি না হলে আবারও এক বছর খাওয়াতে হবে, সেটা অনেক কষ্টের। ইতিমধ্যে নোয়াখালীর মাইজদী থেকে এক ব্যবসায়ী গরু দুটি ১১ লাখ টাকায় কিনতে চাইলেও বাকিতে নিতে চাওয়ায় তিনি রাজি হননি।

দুলাল ব্যাপারী বলেন, ‘ভোলার মানুষ সাধারণত ছোট ও মাঝারি গরুই বেশি কেনেন। বড় গরুর ক্রেতা কম। আমার ছোট সাতটি গরুর মধ্যে চারটি ইতিমধ্যে ভালো দামে বিক্রি করেছি। কিন্তু কালা চান ও সাদা চান বিক্রি নিয়ে এখনো দুশ্চিন্তায় আছি।’

খামারির ছেলে মো. আমিন বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে গরু দুটির যত্ন নিতে নিতে ওরা আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছে। এত বড় গরু হলেও আমাদের সঙ্গে শিশুর মতো আচরণ করে। বিক্রির কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়। আবার না বিক্রি করতে পারায় বাবার মন খারাপ হওয়াতে, আমাদেরও মন খারাপ।’

কালা চানের দাম হাঁকানো হচ্ছে ৮ লাখ টাকা এবং সাদা চানের দাম ৭ লাখ টাকা। ছবিতে কালা চান

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল আজিজুল ও আ. সালাম ব্যাপারী বলেন, ‘কালা চান ও সাদা চানের মতো এত বড় গরু এই এলাকায় আর নেই। মানুষ দূরদূরান্ত থেকে গরু দেখতে আসে। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল ভবিষ্যতে বড় গরুর খামার করার। কিন্তু এখন বিক্রি না হওয়ায় দুলাল ব্যাপারীর অবস্থা দেখে মন বদলেছে।’

একই ইউনিয়নের আরেক খামারি মোহাম্মদ আলীও বড় গরু বিক্রি নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পাঁচটি গরু ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন, যদিও দাম চেয়েছিলেন ১৫ লাখ টাকা। পরে ক্ষতির আশঙ্কায় কম দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, ভোলার হাটে বড় গরুর ক্রেতা কম। এখানে মানুষ সাধারণত এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে গরু কেনেন। বড় গরু বারবার হাটে তুলতে বাড়তি খরচ হয়।

ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ভোলার হাটগুলোতে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্রেতা এক লাখ টাকার নিচে গরু কিনতে আগ্রহী। বড় গরুর চাহিদা তুলনামূলক কম। ফলে কয়েকজন খামারি বড় গরু নিয়ে বিপাকে আছেন, তাঁদের মধ্যে দুলাল ব্যাপারীও একজন। তিনি আরও বলেন, ‘দুলালসহ কয়েকজন খামারি আমাদের পরামর্শে প্রাকৃতিক উপায়ে বড় গরু লালন-পালন করেছেন। আশা করছি তাঁরা ভালো দাম পাবেন। তবে বিক্রি না হলে খামারিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

সূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...