বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ০১:১৪ পূর্বাহ্ন

চিনির মিষ্টিতে শিশুর চঞ্চলতা বাড়ে না, গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
চিনির মিষ্টিতে শিশুর চঞ্চলতা বাড়ে না, গবেষণা

কোনো শিশু যদি হাওয়াই মিঠাই, চকলেট বা অন্য কোনো মিষ্টি খাবার খায়, তাহলে কি সে সত্যিই অতিরিক্ত চঞ্চল আর অস্থির হয়ে ওঠে? অনেক বাবা-মা হয়তো জোর দিয়ে বলবেন এমনটা সত্যিই হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, এই ধারণাটি একদমই সত্য নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটির হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের শিশু আচরণ বিশেষজ্ঞ ড. মার্ক ওলরাইচ ১৯৯০ সালের দিকে শিশুদের ওপর চিনির প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছিলেন। তিনি তাঁর গবেষণাপত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার শিশুদের আচরণে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা চঞ্চলতা তৈরি করে না।

আসলে মিষ্টি খাওয়ার পর সন্তান চঞ্চল হয়ে উঠবে এমন ধারণা মা–বাবার মনে আগে থেকেই থাকে। এই বিশ্বাসের কারণেই সন্তানদের আচরণ দেখার সময় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। অবশ্য অভিভাবকেরা কেন এই ভুল ধারণাটি বিশ্বাস করেন, তা সহজেই বোঝা যায়। জন্মদিনে, বিভিন্ন উৎসব বা অনুষ্ঠানে চিনিযুক্ত খাবার ও মিষ্টির আয়োজন বেশি থাকে। আর এ ধরনের অনুষ্ঠানে শিশুরা এমনিতেই খুব আনন্দিত, চঞ্চল ও অস্থির থাকে। এ অতিরিক্ত এনার্জি বা ছটফটে ভাব আসলে উৎসবের পরিবেশের কারণে তৈরি হওয়া উত্তেজনার কারণে। শিশুদের খাওয়া চিনির জন্য নয়।

অনেকের মনে এই ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে মূলত রক্তে সুগারের বা শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলেই বুঝি শিশুরা অতিরিক্ত ছটফটে আচরণ শুরু করে। তবে এটা সত্য, কোনো মানুষের রক্তে যদি শর্করার মাত্রা হঠাৎ অনেক কমে যায়, তবে চিনিযুক্ত কোনো পানীয় পান করলে দ্রুত শক্তি ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় কেউ যদি মিষ্টি খাবার খায়, তবে শরীরের ভেতর সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা ঘটে।

আমাদের শরীর সাধারণত রক্তে শর্করার এই মাত্রা খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। মিষ্টি খাওয়ার পর শরীরের যদি তাৎক্ষণিক শক্তির প্রয়োজন হয়, তবে সে সেই শর্করা ব্যবহার করে ফেলে। আর যদি বাড়তি শক্তির প্রয়োজন না থাকে, তবে শরীর সেই অতিরিক্ত শর্করাকে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য চর্বি বা ফ্যাটে রূপান্তর করে জমা রেখে দেয়।

অর্থাৎ রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও যদি একটি মিষ্টি খাও, তবে শরীর সেই বাড়তি শর্করাকে সরাসরি চর্বিতে বা ফ্যাটে রূপান্তর করে ফেলে।

তাহলে চিনি খেলে বাচ্চাদের শরীরে অতিরিক্ত শর্করা জমে অতিচঞ্চলতা তৈরি হওয়ার তথ্যটি কোথা থেকে এল? এই ধারণার বেশির ভাগই এসেছে ১৯৯০-এর দশকে ড. ওলরাইচ এবং অন্য বিজ্ঞানীদের করা কিছু গবেষণা থেকে।

জার্নাল অব অ্যাবনরমাল চাইল্ড সাইকোলজিতে ১৯৯৪ সালে একটি মজার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে গবেষকেরা দেখেন, মায়েদের যদি শুধু মুখে বলা হয় যে তাঁদের সন্তান চিনি খেয়েছে, তবে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের বেশি চঞ্চল বা ছটফটে বলে ধরে নেন। অথচ বাস্তবে শিশুরা কোনো চিনিই খায়নি। এই পরীক্ষায় ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী ৩৫ জন ছেলেকে অ্যাসপার্টেম নামের একটি কৃত্রিম মিষ্টি দেওয়া পানীয় খাওয়ানো হয়েছিল। এই উপাদানটি চিনি দিয়ে নয়, বরং অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি করা হয়। কিন্তু গবেষকেরা অর্ধেক ছেলের মাকে মিথ্যা করে বলেছিলেন তাঁদের সন্তানেরা চিনি খেয়েছে। মায়েরা সেই মিথ্যা কথাটিকেই সত্যি বিশ্বাস করে তাঁদের বাচ্চাদের আচরণকে অতিচঞ্চল মনে করেছিলেন।

গবেষণায় দেখা যায়, যেসব মাকে মিথ্যা করে বলা হয়েছিল তাঁদের ছেলেরা চিনি খেয়েছে, তাঁরা তাঁদের সন্তানদের বেশি চঞ্চল ও ছটফটে বলে দাবি করেছেন। গবেষকেরা শুধু মায়েদের মুখের কথাই শোনেননি। তাঁরা মা ও সন্তানদের মধ্যকার কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব মা বিশ্বাস করেছিলেন যে তাঁদের ছেলেরা চিনি খেয়েছে, তাঁরা তাঁদের সন্তানদের খুব কাছ থেকে চোখে চোখে রাখছিলেন। অন্য মায়েদের তুলনায় এই মায়েরা তাঁদের সন্তানদের বেশি শাসন করছিলেন। তাঁদের দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন ও নানা রকম নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। অর্থাৎ, বাচ্চাদের আচরণ আসলে বদলায়নি, বদলেছিল মায়েদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও বিজ্ঞানী ড. ওলরাইচ এই ফলাফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘মানুষের মনের এই প্লেসিবো ইফেক্ট বা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাসের প্রভাব অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

লাফালাফি করতে গিয়ে শিশু যেন আঘাত না পায়। মডেল: আহিল

তবে এই পরীক্ষাটি করা হয়েছিল শিশুদের মাত্র একবার চিনি খাওয়ানোর পর। তাই ড. ওলরাইচ এবং তাঁর সহকর্মীরা বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে টানা ৯ সপ্তাহ ধরে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করার সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা করার পরও তাঁরা শিশুদের চিনি খাওয়া এবং অতি চঞ্চল হয়ে ওঠার মধ্যে কোনো ধরনের প্রমাণ খুঁজে পাননি।

১৯৯৪ সালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত সেই গবেষণায়, গবেষকেরা এমন কিছু শিশুকে নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন যাদের বাবা-মা দাবি করতেন যে তাঁদের সন্তানেরা চিনির প্রতি সংবেদনশীল। বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষায় ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫ জন প্রিস্কুলের শিশু এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ২৩ জন স্কুলের শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রতিটি পরিবারকে টানা তিন সপ্তাহের জন্য তিনটি আলাদা খাদ্যতালিকা বা ডায়েট দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ডায়েটে চিনির পরিমাণ বেশি ছিল, দ্বিতীয়টিতে ছিল অ্যাসপার্টেম এবং তৃতীয়টিতে ছিল স্যাকারিন, যা একধরনের ক্যালরি ছাড়া কৃত্রিম মিষ্টি।

এই পুরো গবেষণাটি করা হয়েছিল ডাবল-ব্লাইন্ড পদ্ধতিতে। এর মানে হলো, কোনো নির্দিষ্ট সপ্তাহে কোন শিশুটি আসলে কোন খাবার খাচ্ছে, তা শিশুরা বা তাদের পরিবার তো জানতই না, এমনকি গবেষণাকারী বিজ্ঞানীরাও তা আগে থেকে জানতেন না।

দল বেঁধে চলছে লাফালাফি

বিজ্ঞানীরা শিশুদের বুদ্ধি ও আচরণ পরীক্ষা করে দেখেন। একই সঙ্গে বাবা-মা, শিক্ষক ও গবেষকদের পর্যবেক্ষণও মিলিয়ে দেখা হয়। সবশেষে দেখা গেল, চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টি কোনো খাবারের কারণেই শিশুদের আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ, চিনি শিশুদের বুদ্ধিমত্তা কিংবা স্বাভাবিক আচরণের ওপর কোনো প্রভাবই ফেলে না।

এরপর ১৯৯৫ সালে বিখ্যাত জার্নাল জামাতে একটি বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে চিনি ও চঞ্চলতা নিয়ে আগে করা ১৬টি আলাদা গবেষণার ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেই বড় পর্যালোচনা থেকেও দেখা যায়, চিনি শিশুদের আচরণ বা বুদ্ধির ক্ষমতাকে মোটেও প্রভাবিত করে না।

মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯৫ সালের সেই গবেষণার তথ্য নিয়ে যে পরিসংখ্যানবিদ কাজ করেছিলেন, তিনি একটি অদ্ভুত কথা জানান। তিনি বলেন, তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে এর আগে কোনো গবেষণায় এত নিখুঁতভাবে না বা নেতিবাচক ফল পাননি। চিনি খেলে শিশুরা অতিচঞ্চল হয়ে ওঠে, এই প্রচলিত ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

সূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...