সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই চট্টগ্রামের বিবিরহাটের ভেতরে কাদা আর পানি জমে পিচ্ছিল অবস্থা। ভেজামাটির ওপর দাঁড়িয়েই চলছে দরাদরি। কেউ ছাগলের দাঁত দেখছেন। কেউ ছাগল হাঁটিয়ে দেখে নিচ্ছেন। এর মধ্যেই দুটি ছাগল নিয়ে হাট থেকে বের হচ্ছিলেন মুজিবুর রহমান। দাম জানতে চাইতেই হেসে বললেন, ‘একটু বেশি মনে হচ্ছে।’
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিবিরহাটে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। নগরের হামজারবাগ এলাকায় বাড়ি তাঁর। সঙ্গে ছিলেন দুই ছেলে। ছেলেদের পছন্দেই ৪১ হাজার ৫০০ টাকায় দুটি মাঝারি আকারের ছাগল কিনেছেন। মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাজেট ছিল ৫০ হাজার টাকা। এই টাকায় পছন্দসই গরু পাইনি। তাই ছাগল কিনলাম। দুই ছেলে ছাগল দুটো পছন্দ করেছে।’
হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের দেশি ছাগল ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের ছাগলের দাম ১৮ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। বড় আকারের কিছু ছাগলের দাম উঠছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
বিবিরহাট ও সাগরিকা পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, এবার গরুর তুলনায় ছাগলের খোঁয়াড়ে ভিড় বেশি। বিশেষ করে ছোট পরিবার ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়েছে। তবে দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের বক্তব্যে মিল নেই। ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় ছাগলের দাম কিছুটা বেড়েছে। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, শেষ দিনে এসে উল্টো কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ, বৃষ্টি আর কম ক্রেতার চাপে এখনো অনেক পশু অবিক্রীত।
বিবিরহাটের এক প্রান্তে লাল রঙের একটি ছাগল নিয়ে বের হচ্ছিলেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। দাম পড়েছে ১৯ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘এই ছাগল ১৫ বা ১৬ হাজার হলে ভালো হতো। কিন্তু ওই দামের ছাগলগুলো পছন্দ হয়নি।’
হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের দেশি ছাগল ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের ছাগলের দাম ১৮ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। বড় আকারের কিছু ছাগলের দাম উঠছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

বিবিরহাটে ছাগল কিনতে আসা পাহাড়তলীর বাসিন্দা আবদুল জব্বার বলেন, ‘গত বছর ১৫-১৬ হাজার টাকায় যে ধরনের ছাগল পাওয়া গেছে, এবার একই ছাগলের জন্য ২০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। দাম কিছুটা বেশি।’ একই ধরনের কথা বলেন আরও কয়েকজন ক্রেতা। তাঁদের ভাষ্য, মাঝারি আকারের দেশি ছাগলের দাম এবার বেশি হাঁকছেন বিক্রেতারা। দরাদরি করলেও সহজে দাম ছাড়ছেন না।
ভোলা থেকে প্রায় ৫০০ ছাগল নিয়ে সাগরিকা হাটে এসেছেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম। ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০০টি। তাঁর কাছে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা দামের ছাগল রয়েছে। জসিম বলেন,‘কাল ঈদ। আজ শেষ দিন। এখন দাম কিছুটা পড়ে গেছে। হাজার দুই টাকা কমেও বিক্রি করছি।’
একই ধরনের কথা বললেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইদুল। তাঁর কাছেও রয়েছে প্রায় ৫০০ ছাগল। গতকাল পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে প্রায় ২০০টি। সারি করে বাঁধা ছাগলগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ মনে করে আমরা বেশি দাম চাই। কিন্তু পরিবহন খরচ, খাবারের দাম—সবই বেড়েছে। তারপরও শেষ বেলায় কম দামেই ছাড়তে হচ্ছে।’ সাইদুল জানান, টানা বৃষ্টির কারণে ক্রেতা কম এসেছে। ফলে অনেক ছাগল এখনো অবিক্রীত। এসব পশু আবার ফেরত নেওয়াও ঝামেলার।
বিবিরহাটেও একই চিত্র। বিক্রেতারা বলছেন, মানুষ হাটে আসছেন ঠিকই, কিন্তু অনেকেই শুধু দাম যাচাই করছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। রাউজান থেকে ছাগল নিয়ে আসা এক বিক্রেতা বলেন, ‘দুই দিন ধরে হাটে আছি। থাকা-খাওয়ার খরচ বাড়ছে। তাই শেষ বেলায় কিছুটা কম দামেও বিক্রি করতে হবে।’
তবে সবকিছুর পরও এবার ছাগলের বিক্রি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিক্রেতারা। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, গরুর দাম এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে ছোট পরিবার ও মধ্যবিত্তদের বড় অংশ ছাগলের দিকে ঝুঁকছে। বিবিরহাটে কথা হয় আগ্রাবাদের বাসিন্দা মোহাম্মদ মনিরের সঙ্গে। ২৮ হাজার টাকায় একটি ছাগল কিনেছেন তিনি। মনির বলেন, ‘আমরা তিন ভাই। আগে সবাই মিলে গরু কোরবানি দিতাম। এখন দুই ভাই বিদেশে। তাই এবার একাই কোরবানি দিচ্ছি। একার পক্ষে গরু কেনা কঠিন। ছাগল কিনেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটা ভালো গরু কিনতে এখন এক লাখ টাকার মতো লাগে। ছাগল তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। ছোট পরিবারে ব্যবস্থাপনাও সহজ।’

হাট ঘুরে দেখা গেছে, মনিরের মতো আরও অনেকেই এবার গরুর বদলে ছাগল কিনছেন। কেউ চাকরিজীবী। কেউ ছোট ব্যবসায়ী। অনেকে বলছেন, সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা এখন হিসাব করেই কোরবানির পশু কিনছেন। বিবিরহাটের বিক্রেতা মোহাম্মদ নুরনবী বলেন, ‘আগে ছাগলকে অনেকে দ্বিতীয় পছন্দ মনে করত। এখন অনেকে পরিকল্পনা করেই ছাগল কিনতে আসেন। কম খরচ, ছোট পরিবার আর সহজ ব্যবস্থাপনার কারণে ছাগলের চাহিদা বাড়ছে।’
বিবিরহাটের ইজারাদার মোহাম্মদ ইসমাইলও একই কথা বললেন। তিনি বলেন, এবার অনেক গরু অবিক্রীত থাকতে পারে। কিন্তু ছাগলের বিক্রি তুলনামূলক ভালো। কারণ, ছাগলের দাম এখনো অনেকের নাগালের মধ্যে আছে।
সূত্র: প্রথম আলো