‘হাম হয়েছিল ছেলেটার। পুরো শরীরে ফুসকুড়ি আর জ্বর। তাই হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। এক মাস পার হয়ে গেল। ছেলেটা এখনো শ্বাসকষ্টে ভুগছে। বাড়িতে নিতে পারছি না। জীবনে এটাই প্রথম ঈদ, যেটা ঘরের বাইরে কাটাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) সামনে কথাগুলো বলতে বলতে চোখ টলমল করে উঠছিল মোহাম্মদ ফোরকানের। গতকাল বুধবার দুপুরে পিআইসিইউর সামনে একটি চাঁটাইয়ের ওপর শুয়ে ছিলেন তিনি। পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই উঠে বসেন। পিআইসিইউর সামনে তখনো বেশ কয়েকটি চাঁটাইয়ে রোগীর স্বজনেরা রয়েছেন। কেউ বসে, কেউ শুয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন তাঁরা।
ফোরকান জানান, তাঁর বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালীতে। তিনি পেশায় কৃষক। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সাত মাস বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ইউসুফের জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তখন ছেলেকে চকরিয়ায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করেন। তবে ছেলে সুস্থ না হওয়ায় গত মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিন দিন ওয়ার্ডে রাখার পর শিশুটিকে পিআইসিইউতে পাঠানো হয়। সেখানে ছয় দিন রেখে ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে অবস্থার অবনতি হওয়ায় এক সপ্তাহের মুখে আবারও পিআইসিউতে নিয়ে যাওয়া হয়। আবারও সেখানে ১০ দিন রেখে গত রোববার রাতে ছেলেকে ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। ওয়ার্ডে তাঁর স্ত্রী শিশুটির সঙ্গে রয়েছেন।
কেউ হাসপাতালের করিডরে বসে আছেন, কেউ আবার মেঝেতে বিছানো চাটাইয়ের ওপর নিঃশব্দে শুয়ে আছেন, আর কেউ বারবার ওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন সন্তানের অবস্থার। কারও সন্তান ভর্তি আছে হাম ব্লকে, কারও সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে, আবার কারও শিশু রাখা হয়েছে পিআইসিইউতে।
ফোরকানের আরও দুই সন্তান রয়েছে। একজনের বয়স ছয় বছর, আরেকজনের তিন। তারা এখন মহেশখালীতে দাদা-দাদির কাছে। ঈদের সময় ছোট দুই সন্তানকে বাড়িতে রেখে হাসপাতালে দিন কাটানো খুবই কষ্টের বলে জানান ফোরকান। তিনি বলেন, ‘ছোট ছেলেটা কখন সুস্থ হবে, সেই অপেক্ষায় আছি। ছেলের চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। তাই এবার কোরবানি দিতে পারব না। তবু ঘরে থাকতে পারলে ভালো লাগত। দুটি সন্তান ঈদের দিন মা-বাবাকে ছেড়ে থাকছে—ভাবতেই কষ্ট লাগে।’

কোরবানির কথা বলতে গিয়ে গত ঈদুল ফিতরের স্মৃতিচারণা করেন ফোরকান। তিনি বলেন, ‘রোজার ঈদে ছোট ছেলেটাকেও কোলে করে ঈদের মাঠে নিয়ে গিয়েছিলাম। পাশে রেখে ছবি তুলেছি। এখন ছেলেটা হাসপাতালে কাতরাচ্ছে।’ কথা বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ফোরকানের। বলেন, আশা করছেন শিগগিরই ছেলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাবে।
মোহাম্মদ ফোরকানের পাশে আরেকটি চাঁটাইয়ে শুয়ে ছিলেন মো. দেলোয়ার হোসেন। নগরের অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার ১৮ মে থেকে চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি তাঁর ছয় বছরের সন্তান। তিনি বলেন, তাঁর ঈদও হাসপাতালেই কাটবে। সাড়ে ছয় বছরের শিশু জিবিএসে (গিলেন-বারে সিনড্রোম) আক্রান্ত। এটি একটি বিরল স্নায়বিক রোগ। যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে স্নায়ুকে আক্রমণ করে।
গতকাল এই দুই পরিবারের মতো আরও কয়েকজন অভিভাবককে দেখা গেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের আশপাশে। কেউ হাসপাতালের করিডরে বসে আছেন, কেউ আবার মেঝেতে বিছানো চাঁটাইয়ের ওপর নিঃশব্দে শুয়ে আছেন, আর কেউ বারবার ওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন সন্তানের অবস্থার। কারও সন্তান ভর্তি আছে হাম ব্লকে, কারও সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে, আবার কারও শিশুকে রাখা হয়েছে পিআইসিইউতে।
একই চিত্র দেখা গেছে হাসপাতালের মেডিসিন, কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিক, নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডেও। তবে হাসপাতালের বারান্দাগুলোর মেঝেতে এদিন অতিরিক্ত রোগী বা স্বজনদের দেখা যায়নি। মেডিসিন ওয়ার্ডের বাইরে কথা হয় ইয়াসিন আরাফাতের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর বাবা তীব্র জ্বর নিয়ে দুদিন ধরে হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা বলছেন, আরও এক দিন থাকতে হবে হাসপাতালে। বাবাকে হাসপাতালে রেখে ঈদ করতে হবে, এটা মেনে নিতে পারছেন না।
হাসপাতালের সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নেমে দেখা হয় নগরের ইপিজেড এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। হাতে প্লাস্টার নিয়ে অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন তাঁর ছোট ভাই। হাতে জরুরি কিছু ওষুধ নিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়ার্ডের দিকে যাচ্ছিলেন মামুন। মুখে স্পষ্ট ক্লান্তি, চোখে তাড়া। তড়িঘড়ি করেই তিনি জানান, ছোট ভাইয়ের কষ্ট এখন কিছুটা কমেছে। তাই চিকিৎসকের কাছে অনুরোধ করেছেন, অন্তত ঈদের দিন যেন তাঁকে রিলিজ দেওয়া হয়। যাতে পরিবার সবাই একসঙ্গে ঈদ করতে পারেন।
সূত্র: প্রথম আলো